জব ও ক্যারিয়ারের ধারণা

শিক্ষা জীবনে ও চাকুরিতে আবেদনের সময় জব ও ক্যারিয়ায়ের পার্থক্য সর্ম্পকে আমার কোন ধারণা ছিলনা।

চাকুরী খোঁজা শুরু করেছিলাম পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে।যারা বড় ছিলেন তাদের কাছ থেকেও সাহায্য/ পরামর্শ পাওয়া যেত। সিভিল সার্ভিস,ব্যাংকিং, শিক্ষকতা ছাড়া আর অন্য সব চাকুরিকে আমরা প্রাইভেট জবের কাতারে ফেলে দিতাম।

পাঁচ টাকা দিয়ে একটা “চাকরির পত্রিকা” , একটা বাংলা দৈনিক, একটা ইংরেজি দৈনিক- এই ছিল আমাদের সময়ে চাকুরি খোঁজার হাতিয়ার। অল্প কিছু চাকুরী প্রার্থীর ইন্টারনেট সুবিধা ছিল।তারও কিয়দংশ তা চাকুরী খোঁজার কাজে লাগাতেন। দু’টো শব্দগুচ্ছ আমরা খুঁজে বেড়াতাম পত্রিকার পাতায় কিংবা জব সাইটে-১) জব ভ্যাকেন্সি, ২) ক্যারিয়ার অপরচুনিটি।

কিছু চাকরির বিজ্ঞাপন শুধু তথ্য দিয়ে ঠাসা থাকে। আর কিছু বিজ্ঞাপনে থাকে খালি একটা চেয়ারের ছবি।আরও থাকে ব্রিফকেইস হাতে সিঁড়ী বেয়ে উপরে উঠে যাওয়া একজন মানুষের অবয়ব। তারপর আসল,কিছু মানুষের হাসিভরা মুখের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপনের চল।

চাকুরির আবেদনকারী হিসেবে জব ও ক্যারিয়ার আমার কাছে সমার্থক ছিল কিছুদিন আগেও। চাকুরিতে কাজ শুরু করার পর অনেকের সাথেই চাকুরির প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। তখন থেকে আলোচনায় উঠে আসে “ক্যারিয়ার” শব্দটি। কোন চাকুরিতে ক্যারিয়ার আছে, কোন চাকুরিতে ক্যারিয়ার নেই-এই বিষয়গুলো আমাদের আলোচনায় বেশ প্রাধ্যান্য পায়। এমনকি একই চাকুরির ভিন্ন ভিন্ন কাজ ভেদে ক্যারিয়ারের ওঠানামা নির্ভর করে- এমন কথাও উঠে আসে আলোচনায়।

চাকুরী খোঁজার ও পাওয়ার প্রথম দিকে চাকুরীর বেতনের অংকটাই আমাদের কাছে ভাল চাকুরীর মাপকাঠি। চাকুরি পাবার পর ভাল চাকুরি সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টাতে থাকে।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কর্মক্ষম সময়ের ৭০-৮০ শতাংশ সময় আমরা কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করি।বাকী সময়ের ২-৩ ঘন্টা ব্যয় হয় কর্মক্ষেত্রের যাত্রাপথে আসা ও যাওয়ার সময়।এ কারণে কর্মক্ষেত্রে আমরা সময় কিভাবে ব্যয় করি, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ,আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর কেমন প্রভাব ফেলে তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শুধুমাত্র আর্থিক প্রণোদনা চাকুরীর একমাত্র বিষয় বলে বিবেচিত হয়না। আরও অনেক নিয়ামক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এই সব বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে আমরা জব  ও ক্যারিয়ার  সম্পর্কে ধারণা পাবার চেষ্টা করব।

জীবিকা নির্বাহের জন্য যে কোন কাজ করে অর্থ উপার্জন করাই চাকুরি বা জব। শুধু জবে সাধারণত কেউ ক্যারিয়ারের  উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করেনা। পাচঁ/ছয় বছর  এই একই কাজটি করবে বলে কেউ ভাবেনা। এই ধরণের কাজ বা চাকুরি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর থাকে শুধু জবে।

ক্যারিয়ার হচ্ছে পরস্পর সম্পর্কিত একাধিক কাজের/চাকুরির অভিজ্ঞতা যা থেকে প্রাপ্ত দক্ষতা ভবিষ্যতে অধিকতর সন্মান ও উপার্জনের অবস্থানে যাবার জন্য সহায়ক হয়। পাঁচ/ছয় বছর পর একই ধরণের কাজ/ চাকুরি করার আগ্রহ থাকলে এবং তাতে উন্নতি করতে চাইলে- তাই ক্যারিয়ার। এক্ষেত্রে অধিকতর সন্মান, উপার্জন ও কঠিণ সমস্যা সমাধানের আগ্রহ উদ্দীপক হেসেবে কাজ করে।

শুধুমাত্র জব ভবিষ্যতে সিভি/রেজুমি বা অন্য চাকুরির আবেদনের ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখেনা।ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে চাকুরির অর্জন কম প্রভাব ফেলে।

ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বর্তমানে অর্জিত দক্ষতা ভবিষ্যতের সাফল্যের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত।

পকেটে মাস শেষে কিছু টাকা পাওয়ার উপায় হচ্ছে জব। ক্যারিয়ার  পেশাদার জীবন তৈরি করার জন্য জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন প্রক্রিয়ার মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করে।যা সমগ্র জীবনের জন্য না হলেও, পেশাদার জীবনের অনেকটুকু পথ পাড়ি দিতে সাহায্য করে।

জবের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক সংযোগের সুযোগ কম। ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক সংযোগের সুযোগ থাকে চারিপাশে। একই ধরণের ক্যারিয়ারে আগ্রহীদের একসাথে কাজ করার, একে অপর কে সাহায্য করার সুযোগ আসে বার বার।

চাকুরীর উদ্দেশ্য থাকে প্রদেয়/আরোপিত কাজ শেষ করা এবং সুপারভাইজারকে বিরক্ত না করা।মূল লক্ষ্য থাকে মাস শেষে বেতন বা বেতনের চেক হাতে পাওয়া। প্রয়োজনের সময় সুপারভাইজারের কাছ থেকে ভাল একটা রেফারেন্স লেটার পাওয়া। যা পেতে হলে নিজের কাজ যথা সময়ে শেষ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কর্মী, সাধারণত, সামর্থ্যের সবটুকু ব্যাবহার করেনা। আবেগীয় শক্তির/ইমোশনাল এনার্জি ব্যবহারও কম থাকে। নুন্যতম মানসিক, শারীরিক, ও আবেগীয় শক্তির ব্যাবহারে প্রয়োজনীয় কাজটুকু করা হয়। সঞ্চয়কৃত শক্তি, সামর্থ্যটুকু ব্যাবহার করা হয় ক্যারিয়ার গোছানোর কাজে, পরিবারকেসময় দিয়ে বা ক্যারিয়ার সম্পৃক্তচাকুরী খোঁজায়।

ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অর্পিত দায়িত্ব পালন করাই শেষ কথা নয়। নতুন নতুন কাজে দক্ষ হওয়া, অভিজ্ঞতা অর্জন করা, পেশাদার সংযোগ তৈরি করা, পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, এবং অধিকতর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলাই ক্যারিয়ারের উদ্দেশ্য। নিজের জব ডেসক্রিপশনের সাথে সাথে বাড়তি দায়িত্ব পালন, সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করা – এই বিষয়গুলো ক্যারিয়ার সমৃদ্ধকরণে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাঁর জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হয়। তার মানে এই না যে, জীবনের সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে হবে। ক্যারিয়ারের লক্ষ্য স্থির করা, সে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে কি করতে হবে তা ঠিক করা, কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে লক্ষ্যে পৌঁছা – এই ধারাবাহিকতাই ক্যারিয়ারে সাফল্য নিয়ে আসে।

একটি উদাহরণঃ

অধিকাংশ মানুষ ষ্টোর কিপারের চাকুরীকে একটি জব হিসেবে বিবেচনা করে।তারা কাজ শুরু করেন। শুধুমাত্র অর্পিত কাজ শেষ করেন। কাজ করতে করতে ঘড়ির দিকে তাকান।কখন সময় শেষ হবে, তারা সেখান থেকে বের হয়ে অন্যকিছু করবেন। এই কাজ তাদের আকর্ষণ করেনা। এই কাজে উন্নতি তারা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেননা। এই ধরণের পরিস্থিতিতে এই চাকুরিটি একটি জব।

এর ব্যাতিক্রম চিত্রও আছে। কেউ কেউ এই কাজটি আনন্দ নিয়ে মনোযোগ দিয়ে করেন। স্বপ্ন দেখেন তিনি একদিন ষ্টোর ম্যানেজার হবেন। কোন এক সময়ে তার নিজের একটি ষ্টোর হবে। এই ক্ষেত্রে ষ্টোর কিপার তার নিজের কাজ শেষ হলে খুঁজে দেখেন কোথায় কি কাজ বাকী। ষ্টোর পরিষ্কার আছে কিনা, ষ্টোরটি কিভাবে পরিষ্কার করা হয়, ষ্টোরের হিসাব নিকাশ কিভাবে করা হয়, ইত্যাদি। প্রশ্নের মাধ্যমে সে কোথায়, কখন, কি ভাবে, কি ঘটে তা বুঝে নিতে চায়। দীর্ঘকাল ষ্টোর কিপার থাকার পর সে এক সময় এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার হয়। পরে এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার থেকে ম্যানেজার হয়। এদের মাঝে কেউ কেউ এক সময় নিজেই ষ্টোরের মালিক হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে ষ্টোর কিপারের চাকুরিটি ক্যারিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

পেশাগত জীবনে কোথায় যেতে চাই, কিভাবে যেতে চাই– এই দু’টো বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকাই জব ও ক্যারিয়ারের মূল বিভাজক।

বর্তমান চাকুরীতে আমি অধিকতর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী কিনা, নাকি শুধু বেতনের টাকাটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ – এই উপলদ্ধিই আমাকে আমার ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিবে।

শুধুমাত্র বেতনের টাকা গুরুত্বপূর্ণ হলে বর্তমান কাজে মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হবার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অর্পিত দায়িত্ব পালন করে, মানসিক ও আবেগীয় শক্তিকে সংরক্ষণ করে তা পছন্দসই ক্যারিয়ার গঠনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। বর্তমান কাজে উন্নতির লক্ষ্য থাকলে মন ও আবেগকে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে ক্যারিয়ারকে সমগ্র জীবনব্যাপিএকটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিটি জবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্জিত দক্ষতার সমষ্টিই আমাদেরকে ক্যারিয়ারে সফল করে তোলে।এই বিবেচনায় প্রতিটি জবই আমাদের কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলে। প্রতিটি জবই ক্যারিয়ারের অংশ। তা ভিন্ন ভিন্ন ধরণের জব হউক বা একই ধরণের। প্রতিটি জবই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এমনকি অপছন্দের জব থেকেও মূল্যবান দক্ষতা অর্জিত হয়।

প্রতিটি জবই পেশাদার সংযোগ স্থাপনের সুযোগ এনে দেয়। ভবিষ্যতে কোন কাষ্টমারের সাথে দেখা হবে, কোন সহকর্মীর সাথে কাজ করার সুযোগ হবে তা অনিশ্চিত।তাই সুযোগ মত প্রতিটি জবেই পেশাদার সংযোগ তৈরি ও লালন  করতে হবে।

প্রতিটি জবেই নিজের সর্বোচ্চ অবদান রাখার মানসিকতা থাকতে হবে। নূন্যতম কাজ করার মানসিকতা কখনই ভাল কিছু নয়। আদিষ্ট কাজের চেয়ে বেশি কাজ করতে হবে। কাজ করার আগ্রহ, শেখার আগ্রহ, কাজে অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপনের আগ্রহ সহকর্মীদের মধ্য থেকে এক জনকে আলাদা করে দেয়। সুপারভাইজার কিংবা মালিকের কাছে এই ধরণের কর্মীর অবস্থান থাকে আলাদা উচ্চতায়।

বর্তমান কাজ কি আমার লক্ষ্য পূরণে সহায়ক?

বর্তমান কাজে কি আমি পরিতৃপ্ত?

এই দু’টো প্রশ্নের উত্তর আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, আমি কি শুধুই জব করছি। নাকি, আমি আমার ক্যারিয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

সিভি তৈরির বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন “সিভি ও রেজুমি তৈরির উপায়” 

সিভিতে আমরা কি কি ভুল করি যা পরিহার উচিত তা জানতে পড়ুন “সিভির যত ভুল”

সিভি ও রেজুমির পার্থক্য বুঝতে পড়ুন “সিভি ও রেজুমির পার্থক্য”

সিভি লিখে দেবার বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত না হবার জন্য পড়তে পারেন সিভি তৈরির বিজ্ঞাপন ও বাস্তবতা”

ই-মেইলে সিভি ও কভার লেটার পাঠানোর কৌশল জানতে পড়তে পারেন ই-মেইলে কভার লেটার ও সিভি পাঠানোর উপায়”