করোনায় প্রবীণদের ঝুঁকি

বিগত ছয় মাসে করোনা শব্দটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। বিষয়টি আমাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছের সাথে খুব একটা জড়িত নয়।

করোনা কাকে আক্রমণ করবে আর কাকে করবেনা এমন কোন সীমারেখা নেই। একদিনের শিশু থেকে শতবর্ষী বৃদ্ধ যে কোন মানুষই এর শিকার হতে পারেন। যে কোন মহামারিতেই স্বাভাবিকভাবে মানুষের প্রাণ রক্ষাটাই সবচেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। অন্য সব বিষয় হয়ে যায় আপেক্ষিক। কিন্তু পৃথিবীতে মহামারী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিপর্যয়ের সাথে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ও ঘটে আশংকাজনক হারে। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর সাত শতাংশ মানুষের বয়স ষাটের উপরে। চলমান সমাজ ব্যবস্থায় ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ পরিবারেই বয়স্কদের গুরুত্ব দিনে দিনে কমতে থাকে। তারা পরিবারের সদস্য অথবা অন্য পরিচর্যাকারীদের হাতে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হন।

আমরা নিগৃহ বা অসদাচরণের শিকার হিসেবে সাধারণত শিশুদের ধরে নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বৃদ্ধরাও নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হন অনেক বেশি। শারীরিক, মানসিক, যৌন, আর্থিক  নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হচ্ছেন বৃদ্ধরা। অবহেলা বলতে সময়মত তার খাবার, চিকিৎসা ও ঔষধ ঠিকমত না দেয়া কে বোঝানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে করোনা মহামারী চলাকালীন সময়ে বয়স্ক নির্যাতনের হার আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছে। শুধু বাসায় নয় বৃদ্ধাশ্রমেও বেড়েছে। সামাজিক দূরত্ব, একাকীত্ব আর আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে বাড়িয়ে দিয়েছে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যা। নির্যাতন কিংবা অবহেলার শিকার হন বা না হন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা এ সময়ে মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকিতে আছেন। মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য – একটি অন্যটির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে সব বয়স্ক ব্যক্তিই কি সমান ঝুঁকিতে আছেন ? বৃদ্ধবয়স নিজেই একটি ঝুঁকি । সাথে ডায়াবেটিস ,উচ্চ রক্তচাপ , হৃদরোগ ,হাঁপানি ইত্যাদি থাকলে তাঁরা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যান্য রোগও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া  দীর্ঘমেয়াদী মানসিক রোগী , ডিমেনশিয়ার আক্রান্তদের পক্ষে করোনাকালীন স্বাস্থ্য বিধি, সামাজিক দূরত্ব মানা কঠিন। তাই তরুনদের তুলনায় বয়োজ্যেষ্ঠ  নাগরিকদের কোভিডে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুন বেশি।

এ সময়ে কি কি মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে?

স্বাভাবিক সময়ে একজন মানুষ রোগাক্রান্ত হলে যে মনোযোগ পেতেন মহামারিকালীন সময়ে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই তাঁদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে –

১) নিজে করোনা আক্রান্ত হবার ভয়

২) আক্রান্ত হলে নিকটজনদের পরিচর্যা পাবেন কি পাবেননা

৩) সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়া, না পাওয়ার অনিশ্চয়তা

৪) সঙ্গী, সন্তান কিংবা পরিচর্যাকারীকে চিরতরে  হারানোর ভয়

৫) বিভিন্ন ধরনের হতাশা, আর্থিক অনিশ্চয়তা

৬) ক্ষোভ, দুঃখ , একাকীত্ব

৭) খাবারে অনীহা

৮) ঘুমের সমস্যা

৯) আত্মবিশ্বাসহীনতা

১০) সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া

১১) অন্যদের সাথে দ্বন্দ

১২) অন্যদের এড়িয়ে যাবার প্রবনতা

১৩) নিজের যত্ন না নেয়া

করোনা ও প্রবীণ

এছাড়ও উদ্বেগ জনিত কারনে কিছু শারীরিক সমস্যা যেমন- শ্বাস কষ্ট, অতিরিক্ত ঘামানো, বুক ধড়ফড়, মাংসপেশীতে টান খাওয়া, পেটের সমস্যা, মাথা ব্যথা, দূর্বল লাগা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

তবে সবার সব সমস্য হয়না।

কেউ যদি আগে থেকে কোন মানসিক রোগে ভোগেন তাহলে এ মহামারীর সময়ে সেসব বেড়ে যেতে পারে। শুচিবায়ু আক্রান্ত রুগীদের আচরণগত সমস্যা বেড়ে যেতে পারে এবং নতুন করে অনেকের শুচিবায়ুর সমস্যা হতে পারে।

যেসব বয়োবৃদ্ধরা ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতি বিভ্রমের রোগ) ভুগছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁদের মাঝে নিজে বুঝতে না পারা, অন্যদের বুঝাতে না পারার কারনে  আচরণগত  সমস্যা অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমরা কি করতে পারি?

আমাদের বয়স্ক প্রিয়জনদের মন ভাল রাখার জন্য, মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য আমারা যা করতে পারি তা হচ্ছে-

  • কোভিড -১৯ সর্ম্পকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা এবং এ বয়সের বাড়তি ঝুঁকির বিষয়ে তথ্য দেয়া। তবে তথ্যগুলো এমনভাবে দিতে হবে যাতে তিনি কোন অবস্থাতেই আতংকিত না হন।
  • সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো ওনাদের বলা এবং চর্চা করতে সহায়তা করা।
  • পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার দেয়া । উত্তেজক খাবার – যেমন অতিরিক্ত চা,কফি, এলকোহল ইত্যাদি পান থেকে বিরত রাখা।
  • পরিমিত বিশ্রামের সুযোগ দেয়া।
  • ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করা।
  • বয়স অনুযায়ী শারীরিক ব্যায়াম করা।
  • উত্তেজিত হলে ,উদ্বিগ্ন হলে কিংবা এমনিতেও শিথিলায়ন (রিলাক্সেশন থেরাপীর) চর্চা করতে পারেন।
  • পূর্বের কোন শারীরিক অথবা মানসিক রোগ থাকলে সেসবের চিকিৎসা ও ফলোআপ (ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সম্ভব হলে অনলাইনে করা ভাল ) নিয়মমত চালিয়ে যাওয়া।
  • আত্মীয়-স্বজন ,বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ফোনে, ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেয়া, গল্প করার সুযোগ দেয়া।
  • অতীতের অর্জন ও ভাল কাজগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, সাহস যোগানো।
  • ওনাদের সাথে নিয়ে গল্পগুজব করা, টিভিতে হাল্কা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান একসাথে উপভোগ করা । সবাই মিলে হাল্কা খেলাধুলা করা (দাবা, কেরাম, লুডু ইত্যাদি)।
  • বই পড়তে, যার যার ধর্মমতে প্রার্থনা করাতে উৎসাহ দেওয়া।
  • কোভিড সংক্রান্ত ইতিবাচক তথ্যগুলো তুলে ধরা- কি বিপুল সংখ্যক মানুষ এ রোগ থেকে সুস্থ্ হয়ে উঠছে , এ সময়ে নতুন করে যেসব মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন হচ্ছে এসব কথা আমরা ওনাদের সাথে আলোচনা করতে পারি।
  • ওনাদের কাছে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান জানতে চাওয়া, ওনাদের অতীত অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন বিষয়ে মতামতগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলে নিঃসন্দেহে ওনারা সংসারে নিজেদের গুরুত্ব অনুভব করবেন।
  • জরুরী বিষয় হচ্ছে করোনা সংক্রান্ত নেতিবাচক খবর, তথ্য ও বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া অন্যান্য অমানবিক ঘটনাবলী তাদের সাথে আলোচনা না করা। টিভিতে /পত্রিকায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত সহিংস বিষয়গুলো যাতে তাঁরা না দেখেন সে বিষয়ে সর্তকতা অবলম্বন করা।
  • বাসায় অন্য সদস্যরাও যাতে সারাক্ষণ ‘করোনা’, ‘করোনা’ না করেন।
  • ঘরে কোন সদস্য করোনা আক্রান্ত হলে সংক্রামক ব্যাধির নিয়ম অনুযায়ী আইসোলেশানে থাকবেন।
  • জৈষ্ঠ সদস্য করোনা কিংবা অন্য যে রোগেই আক্রান্ত হন না কেন , দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
  • তিনি ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগলে বার বার আশ্বস্ত করুন, আপনারা যে কোন পরিস্থিতিতেই তাঁর পাশে আছেন।

মনে রাখবেন, করোনাকালে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব যতটা জরুরী মানসিক নৈকট্য ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতিঃ
ডাঃ শাহানা পারভীন

সহকারী অধ্যাপক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপট নিয়ে জানতে  নিউ নরমাল এ ক্লিক করুণ।